আপনার সন্তানের মানসিক বিকাশের ৫টি উপায়

আপনার সন্তানের মানসিক বিকাশের ৫টি উপায়

September 1, 2018 Behavior and Discipline Emotional Intelligence 0

Lawrence Kutner, Ph.D. একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট। তার মতে শিশুরা তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে (৫-১২ বছর বয়সে) ৫টি Emotional Challenge এর সম্মুখীন হয়ে থাকে। যদি এই সময়ে তারা কিছু স্কিল আয়ত্ব করতে পারে অথবা অভিভাবকরা এই বিষয়গুলোর দিকে নজর রাখেন, তবে তারা তাদের কৈশোর সফলতার সাথে পার করতে পারবে।

শৈশবকালে শিশুরা শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে মানসিকভাবেও বিকশিত হতে থাকে। এই সময়টাতেই তাদের মনে নানা ধরণের প্রশ্ন জাগে। তাদের বুদ্ধির বিকাশ হতে থাকে। তাই এ সময় তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়াটা খুবই জরুরী, কেননা এ সময়টায়ই শিশুরা তাদের আবেগকে (emotion) নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা শুরু করে। আর শৈশবেই আবেগিক দক্ষতাগুলো (Emotional Intelligence) সঠিকভাবে রপ্ত করতে না পারলে ভবিষ্যৎ জীবনে নানা সমস্যায় জড়িয়ে পড়তে হতে পারে, যা কখনোই পিতামাতার কাম্য নয়।

আবেগিক বিকাশ (Emotional Development) বলতে মূলত বোঝায় শিশুটিকে তার অনুভূতি ও আবেগের ব্যাপারে শেখানো, কীভাবে এই আবেগ তার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, এবং অন্যদের আবেগ ও অনুভূতির দিকে কিভাবে লক্ষ্য রাখা উচিত এসব শিক্ষা লাভ করাকেই বোঝায়। এর মাধ্যমেই সে বুঝতে শিখবে কোনটি ভালো বা খারাপ, কোন কাজটি করা উচিত কিংবা উচিত নয়, কিংবা কোন পরিস্থিতিতে পড়লে কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কথাগুলো ভারী শোনালেও শৈশবকাল থেকেই যদি এইসব ব্যাপারগুলোয় নজর না রাখা হয় তাহলে শিশুটির মানসিক (emotional) বিকাশ বাঁধাগ্রস্ত হবে। ছোটবেলা থেকেই একটু একটু করে আবেগিক দক্ষতা গুলো অর্জনে শিশুকে সাহায্য করতে হবে। আর এই গুরুদায়িত্বটি প্রধানত পিতামাতার-ই। তাই আসুন আজ জানা যাক এমনই ৫টি আবেগিক দক্ষতার ব্যাপারে যা আপনার শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

 

১। শিশুকে ধৈর্য্য ধারণ করতে শিখান:

শিশুদের মধ্যে যেই জিনিসটির অভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায় তা হলো ধৈর্য্য। যেকোনো খেলনা হোক, কিংবা কোনো খাবার, অথবা সে যদি আপনাকেও চায়, তা তাকে দিতে হবে এখনি। তারা কোনো কিছুতেই ধৈর্য্য ধরতে চায় না। কিন্তু আমরা জানি যে বাস্তবিক জীবনে ধৈর্য্য না ধরলে কোনোকিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। তাড়াহুড়োর ফল কখনোই ভালো হয় না।

এই শিক্ষাটিই তাদেরকে ধীরে ধীরে দিতে হবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে কোনোকিছুর জন্য ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করাটা কোনো ব্যাপার না হলেও, একজন ৫ বছরের শিশুর কাছে সেটি অনন্তকাল মনে হতে পারে। তাই খুব ধীরে ধীরে শিশুকে ধৈর্য্য ধরা শেখাতে হবে। যদি সে কোনো খেলনা এখন-ই চায় তাহলে তাকে আপনি বলতে পারেন সে যদি এখনি এই খেলনাটি না কিনে তাহলে সে পরে আরোও ভালো একটি খেলনা পেতে পারে। এভাবে শিশুর মতো করেই তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে ধৈর্য্য ধরতে পারা একটি ভালো অভ্যাস। রাস্তায় জ্যামে বসে থাকার সময় আপনার সন্তানের সাথে মজাদার কিছু করে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। এতে সে ধৈর্য্য ধরার ব্যাপারটি নিয়ে হতাশ না হয়ে আরো আগ্রহী হয়ে উঠবে। তাকে প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট পরিমাণ পকেট-মানি অর্থাৎ টাকা দিন। হয়তো শুরুর দিকে সে একবারেই সম্পূর্ণ টাকা খরচ করে ফেলবে। এরপরে তাকে বোঝান যে যদি সে একবারে পুরোটা খরচ না করে প্রতিদিন একটু একটু করে খরচ করে তাহলে সে প্রতিদিনই কিছু না কিছু কিনতে পারবে। এভাবে আপনার শিশুকে টাকা জমাতে শেখান। একটু একটু করে জমিয়ে অনেক টাকা হলে সে তার প্রিয় খেলনাটি কিনতে পারবে। এভাবে তাকে উৎসাহিত করুন ধৈর্য্য ধরতে। ছোটোবেলার এই ছোটো ছোটো শিক্ষাগুলোই তাকে ভবিষ্যৎ জীবনে একজন ধৈর্য্যশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

 

২। শিশু যেন আত্মনির্ভরশীল হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন:

নিজের ক্ষমতার উপরে বিশ্বাস রাখতে পারা একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য খুবই জরুরী। সেজন্য আত্মনির্ভর হওয়ার অভ্যাস করে তুলতে হয় শৈশব থেকেই। নিজের কাজ নিজে করতে পারার আনন্দ শিশুকে একবার বুঝিয়ে দিতে পারলেই সে আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে। প্রথমে প্রথমে হয়তো সে একটু ভয় পাবে, ভুল করবে। কিন্তু তাতেই থেমে না গিয়ে তাকে উৎসাহিত করে তুলুন। শুরুতে অনেক ধীরগতিতে কাজ করলেও আস্তে আস্তে সে বুঝে উঠবে সবকিছু।

আপনার মনে হতে পারে যে এই সামান্য কাজটি করলেই বা কি আর না করলেই বা কি। কিন্তু যেটি আপনার কাছে সামান্য একটি দুই মিনিটের কাজ সেটিই আপনার সন্তানের কাছে অনেক গুরুত্বপুর্ণ এবং কঠিন একটি কাজ মনে হতে পারে। খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরে নিজের প্লেটটি নিজেকেই ধুয়ে রাখতে বলতে পারেন। কিংবা খেলা শেষ হওয়ার পরে খেলনাগুলো গুছিয়ে রাখতে বলুন। প্রথমে হয়তো আলসেমি থেকে সে এগুলো করতে চাইবে না। তখন শিশুকে ছোটোখাটো পুরস্কার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিন। আপনার সাংসারিক কাজে শিশুকে সাহায্য করতে দিন। এভাবে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠবে। হয়ত তার কাছে কাজটি খুব কঠিন মনে হবে শুরুতে, কিন্তু কাজটি যদি সে সঠিকভাবে শেষ করতে পারে তখন যে আত্মতৃপ্তি সে অনুভব করবে, সেটিই তাকে আবার কাজ করতে আগ্রহী করে তুলবে।

৩। নিজের কাজের দায়িত্ববোধ গড়ে তুলুন:

আত্ম-নির্ভরশীলতা এবং দায়িত্ববোধ একে অপরের পরিপূরক। শিশু আত্ম-নির্ভরশীল হয়ে উঠতে হলে তাকে অবশ্যই নিজের কাজের জন্য দায়িত্ব নিতে শিখতে হবে, হোক সেটি ভুল অথবা ঠিক। যদি আপনার সন্তান কোনো ভুল করে বা কোনো খারাপ কাজ করে তাহলে সে অবশ্যই ভীত হবে আপনার সামনে এ ব্যাপারে কথা বলার সময়। আগের উদাহরণটিই ধরুন, আত্মনির্ভর হওয়ার জন্য সে খাওয়ার পরে নিজের প্লেট ধুয়ে রাখতে গেলো। কিন্তু ভুলবশত প্লেটটি তার হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে গেলো। এতে স্বাভাবিকভাবেই সে ভয় পাবে। এসময় হয়তো আপনি তাকে একটু শাসন করতে পারেন।

এতে হয়তো ভয় থেকে সে পরে আরও সাবধান হবে। কিন্তু এতে তার মধ্যে কোনো দায়িত্বজ্ঞান আসবে না, উল্টো সে মানসিকভাবে ভীততটস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু শাসন না করে বরং আপনি যদি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে কেন প্লেটটি পড়ে গেলো এবং কীভাবে এরপর থেকে আরও সাবধান হয়ে কাজ করলে আর সেটি পরবে না, তাহলে সে ভয়ও পাবে না এবং নিজের ভুলটি বুঝতে শিখবে। ‘প্লেটটি ভেঙ্গে গিয়েছে’ এবং ‘আমি প্লেটটি ভেঙ্গে ফেলেছি’ এই দুটি কথার মধ্যকার পার্থক্যই হলো দায়িত্ববোধ। আপনার সন্তানকে এমনভাবে শিক্ষা দিন যেন সে বুঝতে পারে যে ভালো হোক খারাপ হোক নিজের কাজের দায়িত্ব তার নিজেকেই নিতে হবে। অযুহাত দেখানো যাবে না। এতে সে একইসাথে আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে এবং দায়িত্বজ্ঞান অর্জন করবে।

৪। বন্ধু নির্বাচন করতে শেখান:

ছোটবেলায় সম্ভবত সফলতা নির্বাচনের মাপকাঠি হলো বন্ধু নির্বাচন। যার যত বেশি বন্ধু সে তত বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু বড় হতে হতে আমরা বুঝতে পারি যে তা আসলে মোটেও ঠিক নয়। কিন্তু শৈশবে বন্ধু বানানো একজন শিশুর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই এসময়ই তাকে শেখাতে হবে যে কীভাবে সঠিক বন্ধু নির্বাচন করা যায়।

ভালো এবং খারাপ, উচিত এবং অনুচিতের মধ্যকার পার্থক্য (emotional fact) জানতে হবে। এতে সে বুঝতে শিখবে কোন বন্ধুটি ভালো এবং কোন বন্ধুর সাথে কীভাবে মিশতে হবে। কীভাবে কোনো বন্ধুর খারাপ কোনো প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে হয়, সেটি আপনার সন্তানকে শেখান। তাকে বিভিন্ন খেলাধুলা এবং পড়াশোনার বাইরের নানা কাজে উৎসাহিত করুন। এভাবে সে নিজের পছন্দের কাজ করার মাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারবে যা তাকে ভবিষ্যৎ জীবনে সামাজিকীকরণে সাহায্য করবে।

৫। শিশুকে আত্মসংযম করতে শেখান:

আত্মসংযম অর্থাৎ নিজেকে সংযত করতে পারা একজন শিশুর পক্ষে খুবই কঠিন একটি কাজ। ছোটোবেলায় শিশুরা যা দেখে তাই পেতে চায়। এবং আপনিও যদি আদরের বশে সন্তানের সব কিছুতেই হ্যাঁ বলতে থাকেন তাহলে একসময় আপনার সন্তান এমন কিছু চেয়ে বসবে যা দেয়া আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। অপর দিকে তা না পেলে আপনার সন্তান তুলকালাম কাণ্ড করে বসতে পারে। সংযম করা না শিখলে আপনার সন্তান একরোখা হয়ে উঠবে, এবং কোনোকিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারবে না। কোনো খেলায় হেরে গেলে তাতে রেগে গিয়ে বা হতাশ না হয়ে বরং তাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখান ব্যাপারটিকে। খেলাধুলাতে হার-জিত থাকেই তা বুঝতে শেখান।

এবং আবারো চেষ্টা করতে বলুন। তাকে বোঝাতে চেষ্টা করুন যে জীবনে সবকিছু তার নিজের ইচ্ছামতো হবে না। এটি তাকে মেনে নিতে হবে এবং সেভাবেই কাজ করতে হবে। নিজেকে সংযত করতে শেখার মাধ্যমে আপনার সন্তান পারবে কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের আবেগ ও অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে।

শিশুকে কিভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখাবেন সেটি নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ে ফেলুন আমাদের এই লেখাটিঃ আত্মনিয়ন্ত্রণ কিভাবে শেখাবেন আপনার শিশুকে?

এভাবে শৈশব হতেই এসব আবেগিক দক্ষতাগুলো (emotional skills) অর্জনের মাধ্যমে আপনার সন্তানের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ হবে। সে শিখবে কীভাবে নিজের আবেগ ও অনুভূতিসমূহ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এবং নিজের অনুভূতির পাশাপাশি আশেপাশের মানুষজনের অনুভূতির ব্যাপারেও সে বুঝতে শিখবে, যা তাকে একটি সফল ও সুখী জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

 

আর্টিকেলটি Lawrence Kutner, Ph.D. এর লেখা একটি আর্টিকেলের মূল ভাবার্থ। তিনি একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজিস্ট, এবং বর্তমানে হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

মূল আর্টিকেলটি দেখুন এই লিঙ্কে