হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত সাইকোলোজিষ্টের ৫টি উপায়ঃ শিশু সদয় ও যত্নশীল হবে যেভাবে

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত সাইকোলোজিষ্টের ৫টি উপায়ঃ শিশু সদয় ও যত্নশীল হবে যেভাবে

August 30, 2018 Behavior and Discipline 0

Richard Weissbourd বিখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ‘Graduate School of Education’ এর একজন খ্যাতিমান psychologist. তিনি ‘Making Caring Common’ নামে একটি চমৎকার প্রোজেক্ট চালান যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিশুদের কিভাবে আরও সদয় (kind) হিসাবে গড়ে তোলা। তিনি তার অনেক বছরের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ৫ টি ধাপ নির্ধারণ করেছেন যার মাধ্যমে একজন অভিভাবক তার শিশুকে kind এবং caring হিসাবে গড়ে তুলতে পারবেন।

আপনার শিশুর ভালো ভবিষ্যৎ অভিভাবক হিসাবে আপনি তো অবশ্যই চান। এবং সেজন্যই তার পড়াশুনা থেকে শুরু করে কত কিছুর পিছনেই আপনার সময় এবং অর্থ ব্যয় করেন। কিন্তু শিশুর মধ্যে এই গুণটি তৈরি হল কিনা সেটির জন্য আমরা আসলে কতটা চিন্তা করি? আবার যারা কিছুটা ভাবি তারা অনেক সময় বুঝতে পারি না কিভাবে সেটি করা যায় ভালোভাবে।

আমাদের এই লেখায় আমরা ধাপে ধাপে সেই বিষয়গুলো তুলে ধরেছি। Richard Weissbourd এর মতে অভিভাবকরা যদি নিচের ৫ টি ধাপ ঠিকমতো মেনে চলেন তাহলে শিশুর মধ্যে এই গুণগুলো তৈরি হবে। চলুন দেখে নেই উনি কি কি পরামর্শ দিয়েছেন।

 

১। অন্যের প্রতি যত্নশীল হওয়াকে গুরুত্বের সাথে নেয়া

কেন?

বাবা-মা সবসময়ই বাচ্চার সুখ, বাচ্চার আনন্দকে প্রাধান্য দেয়। বাচ্চার চাওয়া এবং প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেয়া হয় পরিবারের অন্য সবার আগে।

কিন্তু বাচ্চাদের অবশ্যই ব্যালেন্স করা শেখাতে হবে নিজের চাওয়া ও পরিবারের অন্যদের চাওয়ার উপরে। অনেকটা ঠিক ফুটবল বা পিলো-পাস খেলার মত। শুধু নিজের কাছেই বল রেখে দিলে খেলায় জেতা কখনও সম্ভব নয়। সবাই মিলে একজনের পর অন্যজনের কাছে বলটি গেলেই শুধুমাত্র খেলায় জেতা সম্ভব। ব্যক্তিগত জীবনেও ব্যাপারটি সেরকমই। এটি শিশুকে অবশ্যই শিখিয়ে ফেলতে হবে আপনার।   

 

কিভাবে?

বাচ্চাকে অবশ্যই বাবা-মার শেখাতে হবে যেন সে অন্যের প্রতি কেয়ারিং হয়। এটার গুরুত্ব দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। 

  • শিশুকে আমরা অভিভাবকরা বলি ‘অমুক জিনিসটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’। যেমন অভিভাবকরা বলেন, পড়াশুনা ঠিকমতো করছ – এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তুমি জীবনে সুখী’ – এটির পরিবর্তে শিশুকে বলুন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তুমি সবার প্রতি কেয়ারিং হচ্ছ’। 
  • আপনার শিশুর কাছে গুরুত্বপূর্ণ এমন বিষয়গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং প্রাধান্য দিন। তাকে এটাও শেখান যে অভিভাবকদের অনেক ব্যাপারও তাকে খেয়াল রাখতে হবে, কেয়ার করতে হবে। 
  • শিশুকে ‘চাওয়া বনাম দরকারের’ পার্থক্য শেখান। এটি কিভাবে শেখাবেন সেটির বিস্তারিত দেখুন আমাদের এই লিঙ্কে
  • স্কুলে আপনার শিশুর শিক্ষককে বলুন যে আপনি আপনার শিশুর রেজাল্টের পাশাপাশি তার আচরণের প্রতিও অনেক মনোযোগী। তাই শিশু অন্যর সাথে কেয়ারিং আচরণ করে কিনা, বন্ধুদের সাথে তার আচরণ কেমন সেগুলো সম্পর্কে জানুন। 

 

২। শিশুকে Caring এবং Gratitude প্র্যাকটিস করার সুযোগ দিন 

 

কেন? 

একজন ভালো মানুষ একদিনেই তৈরি হয়ে যাবেনা। ছোট ছোট কাজ এবং প্র্যাকটিসের মাধ্যমে এসব মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো সম্ভব। তাই শিশুকে এই গুণাবলিগুলোর প্র্যাকটিস নিয়মিতভাবে তার দৈনন্দিন জীবনে রাখতে হবে। 

বাচ্চাদের অবশ্যই অন্যের প্রতি  Caring হতে হবে এবং অবশ্য কৃতজ্ঞ থাকতে হবে তাদের প্রতি যারা তার নিয়মিত যত্ন নিচ্ছে বা care করছে। সে যেন মনে না করে বাবা-মার দায়িত্ব হচ্ছে খালি তার যত্ন নেয়া। আজকাল অভিভাবকরা বেশি care নিতে যেয়ে আবার শিশুদের বিগড়ে ফেলছেন। 

গবেষণায় প্রমানিত হয়েছে যেসব বাচ্চা ছোটবেলা থেকেই কৃতজ্ঞতা (gratitude) প্রকাশ করে সবকিছুতে তারা পরবর্তি জীবনে অন্যকে সাহায্য করে, অন্যের ভুল বা দোষ খুঁজে বেড়ায় না এবং সবশেষে সুখি আর ভালো মানুষ হিসেবে জীবনযাপন করে।

 

কিভাবে?

গান গাওয়া বা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর মতই অন্যের প্রতি যত্নশীল (caring) হতে ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে অনেক দিন প্র্যাকটিসের প্রয়োজন হয়। যেমন – বন্ধুর বাড়ির কাজে সাহায্য করা, ক্লাসে কারও ব্যাগ থেকে পেন্সিল পড়ে গেলে তা উঠিয়ে দেয়া,বাসায় ছোট ভাই-বোনকে নিয়ে একসাথে খেলা ইত্যাদি বিভিন্ন কাজের উদাহরন।

  • অন্যের প্রতি কেয়ারিং হওয়াকে বাচ্চার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করুন। বাচ্চার প্রতিটি কাজেই অতিরিক্ত প্রশংসা করবেন না।  যেমন ধরুন, আপনার বাচ্চা যদি খাবার টেবিলে একটু সাহায্য করে বা বাসার অন্য কারও জন্য একটু কাজ করে তবে অতিরিক্ত প্রশংসা না করাই ভালো। এতে তার কাছে মনে হবে না যে সে অতিরিক্ত কিছু করেছে। সে এই কাজ যে করছে এবং এটাই স্বাভাবিক – এটা তার মনে হবে। তবে অনেক ভালো কিছু যা করার কারনে আপনি অনেক খুশি হয়েছেন তার জন্য শিশুর প্রশংসা অবশ্যই প্রাপ্য।
  • শিশুরা টিভিতে প্রতিদিন কত কিছু দেখে। আবার বাসায় বা স্কুলে প্রতিদিন অনেক ঘটনা ঘটে যেগুলো সে দেখে। এমন যেসব ব্যাপার বা ঘটনা যেখানে কেউ কারও প্রতি যত্নশীল (caring) আচরণ করেছে বা বিরূপ আচরণ করেছে সেটি নিয়ে শিশুর সাথে কথা বলুন। তাকে জিজ্ঞেস করুন কোন ব্যাপারটি তার বেশি ভালো লেগেছে? কেন ভালো লেগেছে? সে নিজে ঐ রকম পরিস্থিতিতে কি করত?
  • অন্যর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বা গ্রেটফুল হওয়াকেও বাচ্চার নিয়মিত আচরনে পরিণত করুন। বাসার সবাই থেকে শুরু করে, রাস্তায় বা স্কুলে যে যেভাবে আমাদের প্রতিদিনের কাজে সাহায্য করছে তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। যেমন রিক্সা থেকে নামার পর রিক্সাওয়ালাকে ধন্যবাদ দেয়া, দোকান থেকে কিছু কেনার পর দোকানদারকে ধন্যবাদ দেয়া, বাসায় কেউ পাশের রুম থেকে একটু পানি এনে দিলেও একটু হাসি দিয়ে তার প্রতি Thankful হওয়াটা ভালো। ব্যাপারটি অনেক ছোট মনে হলেও এটি নিয়মিত নিজে করলে শিশু আপনার কাছ থেকে শিখবে এবং শিশু নিজেও করবে। 

 

৩। শিশুর পরিচিত মানুষের পরিধি বাড়ান 

 

কেন?

প্রায় প্রতিটি বাচ্চার পরিচিত মানুষের পরিধি শুরুতে খুব ছোট থাকে। কাছের পরিবারের মানুষ। এরপর স্কুলে যাওয়া শুরু করলে শিক্ষক এবং বন্ধুরা হয় তার পরিধি আরও বড় হয়। কেবল তাদের সুবিধা বা সমস্যাগুলো নিয়ে সে কিছুটা কেয়ার করে। এই পরিধি অবশ্যই বাড়াতে হবে।

আপনার চ্যালেঞ্জ হবে যখন শিশুকে তার এই ছোট পরিধির বাইরের কারোর জন্য কেয়ারিং হতে হবে। যেমন – স্কুলে নতুন কেউ আসলে তার সাথে সুন্দর করে কথা বলা ও মেশা। এই পরিধি বড় না হলে এবং তাদের প্রতি কেয়ারিং হতে না শিখলে আপনার শিশুর গণ্ডি এরকম ছোট্টই থেকে যাবে। 

 

কিভাবে? 

 

  • বাচ্চাদেরকে অবশ্যই নিজের গন্ডির বাইরের অপরিচিত সবার সাথে সুন্দর করে কথা বলার অভ্যাস করাতে হবে। বাসার কাজের লোক বা দোকানের অপরিচিত জিনিসপত্র মাপার লোকের সাথেও সম্মানের সাথে সুন্দর করে কথা বলতে হবে।
  • দুর্বলের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করতে হবে। যেমন- খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছে এমন বাচ্চাকে বা কোনও কারনে সবাই খেপাচ্ছে এমন বাচ্চার সাপোর্টে দাঁড়ানো।

 

৪। সন্তানের সামনে নিজেকে রোল মডেল হিসাবে তুলে ধরুন

কেন? 

আমরা সবাই জানি বাচ্চারা শেখে বাবা-মা বা বাসার অন্য সবাইকে দেখে। বাসার বড় বোনটি যদি পড়তে বসে তাহলে ২ বছরের ছোট্ট বাচ্চাটিও সাথে সাথে বই-খাতা নিয়ে বসতে চায়। তাই বাচ্চাকে ভালো কিছু শেখাতে এবং ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অবশ্যই আপনার দায়িত্বই বেশি। আপনাকেই এমন একজন হতে হবে যাকে আপনার বাচ্চা অনুসরণ করবে। 

কিভাবে?

  • নিজের বাসার কাজের মানুষের সাথে ভালো আচরণ করুন, তাকেও প্রাপ্য সম্মান দিন। এতে করে আপনার সন্তানও তাকে সেই সম্মানটুকু দিবে।
  • নিজে প্রতিদিন এমন কিছু কাজ করুন যেগুলো থেকে শিশু শিখতে পারে। আপনার স্ত্রীকে কাজে সাহায্য করুন। নিজের বাবা-মা এবং আত্মীয়স্বজনদের প্রতি খেয়াল রাখুন। এগুলো ছোট ছোট জিনিস দেখে আপনার শিশু বড় হবে এবং সেগুলো শিখবে।
  • প্রতিদিনই আমরা বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাই। বাচ্চার নিজের এমন পরিস্থিতির সমাধান তাকে নিজেকেই করতে দিন। যেমন- “মা আমার জন্মদিনে কি পাশের বাসার নতুন মেয়েটাকে দাওয়াত করবো? আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ওকে এমদমই পছন্দ করেনা।” এমন সব প্রশ্নের উত্তরে নিজে কিছু না বলে যুক্তি বা কারনগুলো তুলে ধরুন, সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব দিন আপনি আপনার বাচ্চাকেই।

 

৫। বাচ্চার ধ্বংসাত্মক আচরন কন্ট্রোল করতে সাহায্য করুন

 

কেন? 

নিজের আচরণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারার মতো গুণ খুব কমই আছে। যেসব শিশু এটি ছোটবেলা থেকেই শেখে তার জন্য জীবনে অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায়।

বাচ্চাকে সাহায্য করুন তার নিজের Negative feeling বা ধ্বংসাত্মক আচরন কন্ট্রোল করতে। মাঝে মাঝে রাগ করা বা নিজের অনুভুতি কন্ট্রোল করতে না পারাটা স্বাভাবিক। এই ব্যাপারটি বাচ্চাকে বুঝতে সাহায্য করুন। মাঝে মাঝে রাগ, কষ্ট, অভিমান, হিংসা এই সবই স্বাভাবিক। আমাদের চেষ্টা করতে হবে এই ধ্বংসাত্মক আচরনগুলো নিজেদের আয়ত্তে রাখা।

 

কিভাবে?

 

  • নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার সহজ একটি কৌশল বাচ্চাকে আপনি শেখাতে পারেন। কৌশলটি হল নাক দিয়ে অনেক বড় করে নিঃশ্বাস নেয়া এবং এরপর তা মুখ দিয়ে বের করা। বাচ্চা যখন অনেক বেশি আপসেট হয়ে থাকবে তখন আপনি নিজেও তার সাথে এটি করতে পারেন।
  • আরও কিভাবে বাচ্চার আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারেন তা জানতে এই লিংকে দেখুন http://kidstimebd.com/how-to-teach-self-control-to-children/ 

 

পরিশিষ্ট 

আমাদের এই লেখায় আমরা কিছু কিছু উদারহন দিয়েছি যেগুলো অভিভাবকরা কাজে লাগাতে পারবেন। কিন্তু এর বাইরে আপনি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উপায়ে এই বিষয়গুলো শিশুকে শেখাতে পারবেন। যেদিন আপনি আপনার সন্তানের পড়াশুনার জন্য বা ভালো রেজাল্টের জন্য যতটা সিরিয়াস, শিশুর মধ্যে caring শেখানোর ব্যাপারে সমান সিরিয়াস হচ্ছেন না – ততদিন পর্যন্ত আসলে আপনি আপনার শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক পথে ভাবছেন না।

দরকার হলে লেখাটি সেভ করে রাখুন। আরও একবার দুইবার পড়ুন। নিজের ভেতরে পুরো ব্যাপারটি নিয়ে নিন। কিছু আচরণ আপনি নিজে আজকে থেকে শুরু করুন।

মনে রাখবেন, শিশুদের প্রথম শিক্ষক হচ্ছে তার মা-বাবা। আপনারা দুজন যে ধরণের আচরণ অন্যর সাথে করছেন সেই আচরণই আপনার শিশু তাদের সাথে করবে। এবং ভবিষ্যতে আপনার শিশুর ভালো আচরণ এবং খারাপ আচরণ – দুটোর প্রভাবই আপনাদের দুজনের জীবনেই পড়বে।

………………………………………………………………………

Parenting নিয়ে অনলাইন কোর্স 

Parenting এর উপর বাংলাদেশে প্রথম অনলাইন কোর্স শুরু হয়েছে আমাদের Teachers Time এর পোর্টালে। এই অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে একজন অভিভাবক নিজের সন্তানের মানসিক বিকাশ সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং শিশুর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবেন। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে কোর্স করতে পারবেন যেকোনো সময় আপনার স্মার্টফোন থেকেই। নিচের ছবিতে ক্লিক করে চলে যান সরাসরি রেজিস্ট্রেশন লিঙ্কে।

রেজিস্ট্রেশন লিঙ্কঃ https://teacherstimebd.com/auth/register

 

…………………………………………………………………

লেখাটি লিখেছেন তাহমিনা রহমান সাথী। তিনি আমাদের কিডস টাইমের প্রোগ্রাম হেড।