আত্মনিয়ন্ত্রণ কিভাবে শেখাবেন আপনার শিশুকে?

আত্মনিয়ন্ত্রণ কিভাবে শেখাবেন আপনার শিশুকে?

May 24, 2018 Behavior and Discipline Future Skill 0

আমরা আগের আর্টিকেলে জেনেছি কেন আপনার সন্তানকে আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-control) শেখানো জরুরি। যেসব শিশুর আত্মনিয়ন্ত্রণ বেশি তারা পড়াশুনা থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে ভালো চাকুরি, এবং জীবনে সুখী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। বিস্তারিত জানতে পারবেন আমাদের আগের লেখায়।

এখন যদি বুঝে থাকেন যে আসলেই এটি খুব জরুরি একটি বিষয় তাহলে এখন প্রশ্ন হল কিভাবে আমরা আমাদের সন্তানদের আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-control) শেখাতে পারি।

এই আর্টিকেলে আমরা কিছু সাধারণ নিয়মের কথা বলবো যেগুলো মেনে চললে অভিভাবক (এবং শিক্ষকরা) শিশুদের আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখাতে পারেন। চলুন তাহলে সেই নিয়মগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।

তবে শুরু করার আগে একটি কথা বলে নেয়া ভালো যে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রধান ভিত্তি হল বিশ্বাস। শিশু যদি আপনাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে তাহলেই সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে।

উদারহণ দেই। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। মনে করুন, শিশুকে আপনি বলেছেন যে যদি সে পরীক্ষায় ভালো করে তাহলে তাকে অমুক জিনিসটি কিনে দিবেন। তাই এখন সে বেশি কার্টুন না দেখে যেন পড়ায় বেশি মনোযোগ দেয়। এই কাজটি অভিভাবকরা নিয়মিতভাবে করে থাকেন। যাই হোক, এরকম আপনি যদি বলেন, এবং শিশু সত্যি সত্যি অনেক সময় এবং মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করলো। কেউ হয়তো আপনার চাওয়া অনুযায়ী ফলাফল করতে পারলো, আবার কেউ হয়তো পারলো না। কিন্তু পরিশ্রম হয়তো সে ঠিকই করেছে। দুটোর যেটাই হোক না কেন, পরীক্ষার ফল দেয়ার পর কিন্তু শিশু ঠিকই মনে রাখবে যে আপনার উপহার দেয়ার কথা। তখন যদি আপনি সেটি না দেন তাহলে শিশু আপনার উপর বিশ্বাস হারাবে। এরপর থেকে আপনি আবারও যদি এরকম কোন একটা শর্ত দিয়ে কাজ আদায় করে নিতে চান, সেক্ষেত্রে আগেরবারের মত আপনাকে আর বিশ্বাস করবে না শিশু। তাই তখন সে ভবিষ্যতে কিছু পাওয়ার আশায় (আপনার উপহার) এখনকার আত্মনিয়ন্ত্রণের প্র্যাকটিস (কার্টুন না দেখা) আর করবে না। কারণ আপনি তার বিশ্বাস একবার ভেঙেছেন। এইজন্য সন্তানকে কোন আশা বা পুরস্কার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়ার আগে ভালোমতো ভেবে নিন।

এখন যদি বুঝে থাকেন যে কি ধরণের বিশ্বাসের কথা বলছি তাহলে আমরা পরবর্তী ধাপগুলো বা নিয়মগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

চলুন দেখে নেই ৫ টি উপায়ের কথা যার মাধ্যমে আপনি শিশুকে আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-control) শেখাতে পারেন। এগুলোর সবগুলোই যে আপনাকে মেনে চলতে হবে তা নয়। তবে যত বেশি পারবেন তত ভালো এবং এটিকে আপনার অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ। ৫-৬ মাস করে বাদ দিলেন তাহলে কিন্তু হবে না। আর ভালো কথা, এই ৫ টি উপায় পৃথিবীর অনেক বড় বড় শিশুবিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এবং তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা তৈরি করেছি আপনাদের জন্য।

১। শিশুকে তার আবেগ বুঝতে সাহায্য করুন

যেসব শিশুরা তাদের নিজেদের আবেগ বুঝতে পারে না তাদের সাধারণত আত্মনিয়ন্ত্রণ কম থাকে। যে শিশু বলতে পারে না ‘আমি রাগ করেছি’, সে শিশু সাধারণত কিছু ভাঙে বা কাউকে আঘাত করে তার রাগ প্রকাশের জন্য। যে শিশু বলতে পারে না ‘আমার মন খারাপ’, সে শিশু হয়তো মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি করে আর কান্নাকাটি করে তার মন খারাপ প্রকাশের জন্য।

শিশুকে তার আবেগ বুঝতে সাহায্য করুন। তাকে বলুন যে রাগ করা, মন খারাপ করা স্বাভাবিক। কিন্তু রাগ করে কোন কিছু ভাঙা বা কাউকে আঘাত করা অনুচিত।

আবেগ এবং আচরণ দুটি ভিন্ন জিনিস। এই ব্যাপারটি শেখানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শিশুকে তার আবেগকে শনাক্ত করা শেখানো।

সিসেমি স্ট্রিটের কিছু চমৎকার ভিডিও আছে এর উপরে। সেগুলো শিশুকে দেখাতে পারেন। এমনকি নিজে দেখেও বুঝতে পারেন কিভাবে শিশুর সাথে তাদের আবেগ নিয়ে কথা বলা যায়। নিচের ছবিতে ক্লিক করে একটি ভিডিও দেখতে পারেন। কিন্তু আগে পুরো লেখাটি শেষ করুন।

নিজের অনুভূতিকে শনাক্ত করা

২। খুব পরিষ্কারভাবে নিয়ম ঠিক করে দিন

ছোট শিশুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি। ২-৫ বছর বয়সী শিশুরা অনেক সময় আপনার বলে দেয়া নিয়ম ফলো করতে পারে না। কারণ তারা খুব একটা মনোযোগ দিয়ে শুনে না। তাই কোন নিয়ম বলার পর তাকে আরেকবার বলতে বলুন। নিয়ম ঠিক করার সাথে সাথে সেটার কারণটাও অবশ্যই তাকে বলুন। সে যেন বুঝতে পারে কেন এই নিয়মটি করা হয়েছে তার জন্য।

শিশুরা যেহেতু খুব দ্রুত কোন কিছু ভুলে যায় তাই যে কোন নিয়ম তাকে বার বার মনে করিয়ে দিতে হবে। মনে করুন, খেলার পর তার সব খেলনা গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনি শিশুকে দিয়েছেন। তাই খেলা শেষ হওয়ার পর সে যদি সেগুলো মাটিতে এলোমেলো করে ফেলে চলে যায়, তাহলে তাকে ডেকে মনে করিয়ে দিন এবং গুছিয়ে রাখতে বলুন। নিজে নিজে গুছাতে যাবেন না।

 

৩। বার বার মনে করিয়ে দিন

সন্তানের জন্য যেসব নিয়ম আপনি সেট করে দিয়েছেন সেগুলো মাঝে মাঝেই মনে করিয়ে দিন যখন সে ভুলে যাচ্ছে। শিশুরা অল্পতেই ভুলে যায়। সেটাই স্বাভাবিক। তাই অভিভাবক হিসাবে আপনার দায়িত্ব হচ্ছে আপনার সন্তানকে বার বার মনে করিয়ে দেয়া। বিরক্ত হওয়া যাবে না। এরকম বার বার মনে করিয়ে দেয়ার মাধ্যমে এক সময় সে আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখবে।

ধরুন, আপনার সন্তানের জন্য প্রতিদিন ১ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে কার্টুন দেখার জন্য। কিন্তু কোন কোন সময়ে সে মোট ১ ঘণ্টা কার্টুন দেখতে সেটা ওকেই ঠিক করতে দিন। সে হয়তো স্কুল থেকে ফিরে বিকালে ৩০ মিনিট দেখতে চায়। আবার হয়তো সন্ধ্যায় খাবার আগে ৩০ মিনিট দেখতে চায়। তাকে তার মতো করে সেট করতে দিন। এরপর আপনার দায়িত্ব হচ্ছে সে যদি এক ঘণ্টার বেশি কার্টুন দেখে সেটি তাকে মনে করিয়ে দেয়া। তাকে বলুন যে সে নিজেই ঠিক করেছে যে দিনে ১ ঘণ্টা কার্টুন দেখবে। কিন্তু আজকে সে ইতিমধ্যে বেশি দেখে ফেলেছে।

 

৪। অপেক্ষা করাকে উৎসাহিত করুন

শিশুরা কোন কিছু পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে রাজি হয়না। তাদের ধৈর্য অনেক কম। কিন্তু অপেক্ষা করে কিছু পাওয়া (delayed gratification) শেখানো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এতে করেই শিশুর মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়। শিশুকে আপনি শেখাবেন যে অপেক্ষার ফল সবসময় ভালো হয়। কথায় বলে না, সবুরে মেওয়া ফলে।

অনেক সময় আপনার সন্তানকে শেখাতে হবে কিভাবে সে অপেক্ষা করতে পারে। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে।

যেমন, অনেক সময় শিশুরা খেলনা কেনা বা আইসক্রিম খাওয়া নিয়ে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে কিভাবে শিশুকে শিশুকে বুঝান নিজেকে কন্ট্রোল করতে। কোন কিছু চাওয়া মাত্র যদি শিশু সেটি পেতে থাকে তাহলে সে কোনদিন আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখবে না।

আপনার হয়তো শিশু যা চাচ্ছে তাই কিনে দেয়ার ক্ষমতা আছে। তাই বলে সবসময় চাওয়া মাত্র কিনে দিবেন না। কিনে দিলেও কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলুন।

শিশুরা কিভাবে নিজেদের কন্ট্রোল করতে পারে তার উপর বেশ কিছু টেকনিক তাকে শিখিয়ে দিতে পারেন। সেগুলো নিয়ে আমরা পরের একটি লেখায় আলোচনা করবো।

 

৫। সন্তানের সামনে নিজেকে রোল মডেল হিসাবে তুলে ধরুন

আপনার সন্তানের সামনে প্রথম রোল মডেল হচ্ছেন আপনি। শিশু যতই ছোট হোক না কেন সে প্রতিনিয়ত আপনাকে ফলো করে। তাই শিশুর সামনে নিজেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের রোল মডেল হিসাবে তুলে ধরুন।

আপনার আচরণ যেন সংযত এবং সম্মানজনক থাকে পরিবারের সবার সাথে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। রেগে যাওয়া, বকাবকি করা থেকে শুরু করে অন্য সব কাজে যেন আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন সেদিকে খেয়াল রাখবেন।

আপনার মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব থাকলে সেটি আপনার সন্তানের মধ্যেও দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সবকিছুকে পজিটিভভাবে নিন এবং সেরকম ব্যাবহার করুন।

এর পাশাপাশি অন্য বিখ্যাত রোল মডেলদের নিয়েও শিশুর সাথে কথা বলুন। এতে করে তার মধ্যে ওই রোল মডেলদের গুণাবলি অনুকরণ করার সম্ভাবনা থাকবে।

 

আপনার সন্তানের বয়স ২-৩ বছর হওয়ার থেকেই এই ৫টি নিয়মের দিকে একটু বিশেষভাবে খেয়াল রাখবেন। এতে আশা করা যায় আপনার শিশুর মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ দক্ষতা তৈরি হবে খুব ভালো।

আমরা আমাদের পরবর্তী লেখায় শিশু কিভাবে নিজের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের কিছু কৌশল আয়ত্ত করতে পারে সেটি নিয়ে লিখবো। সেই কৌশলগুলো আপনি নিজে আপনার শিশুকে শিখিয়ে দিতে পারবেন খুব সহজে।

শেষ করার আগে আরও একবার মনে করিয়ে দিতে চাই, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল হবে সেটির অনেক বড় একটা মাপকাঠি হচ্ছে, আপনার শিশুর মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণ কতটা আছে সেটি। তাই এই বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবেন এই কামনা করছি।

সিসিমপুরের ইউটিউব চ্যানেলে বেশ কিছু চমৎকার ভিডিও আছে যেগুলোর মাধ্যমে শিশুকে আপনি পরিকল্পনা করা, আত্মনিয়ন্ত্রণ করা, ভাগাভাগি করা, সঞ্চয় করা ইত্যাদি শেখাতে পারেন। নিচের ছবিতে ক্লিক করে সরাসরি চলে যান সিসিমপুরের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে।

 

শিশুদের মানসিক বিকাশ, ভবিষ্যৎ স্কিল (যেমন সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ইত্যাদি) নিয়ে আমরা নিয়মিতভাবে আর্টিকেল পাবলিশ করি। সেগুলো দেখতেও ভুলবেন না।

……………………………………………………………………………………………………………………………………………

আমাদের Kids Time সেন্টারগুলোতে আগামী ব্যাচের ভর্তি শুরু হয়েছে। ক্লাস শুরু হবে জানুয়ারি ২০১৯ থেকে। কিন্তু তার আগেই অভিভাবকদের সীট বুক করার জন্য রেজিস্ট্রেশন করে ফেলতে হবে। এরপর আমরা অভিভাবকদের ইন্টারভিউয়ের জন্য কল করবো।

আমাদের প্রতিটি সেন্টারে সীট খুব সীমিত। প্রতি ৫ টি আবেদনের মধ্যে ১ জন সাধারণত ভর্তির সুযোগ পায়। এবং আগে যারা আবেদন করেন তারাই আগে সুযোগ পাবেন ভর্তির ব্যাপারে।

বিস্তারিত জানতে নিচের ছবিতে ক্লিক করুন।

কোর্স নিয়ে যেকোনো প্রশ্ন থাকলে কল করুন এই নাম্বারেঃ ০১৭৭১৫৮৮৪৯৪

আমাদের সেন্টারগুলোর ম্যাপ 

নিচের ভিডিওটি থেকে ৩০ সেকেন্ডে দেখে নিন আমরা কি করি, কেন করি।

 

…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….

 

মেটলাইফ ফাউন্ডেশনের সাথে সিসেমি ওয়ার্কশপ, “ইচ্ছে জমা করি-পরিবারের আর্থিক ক্ষমতায়ন গড়ি” নামে একটি প্রকল্প শুরু করেছে যা পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি উদ্যোগ। এই প্রকল্পটি শিশু ও তাদের পিতা-মাতা বা যত্নকারীদের লক্ষ্য নির্ধারণ, আকাঙ্ক্ষা তৈরি, পরিকল্পনা তৈরি এবং প্রতিদিন তারা য়ে পছন্দ তৈরি করে সেই স্বপ্ন অর্জনে সহায়তা করবে। শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য সিসেমি স্ট্রীট এর বিষয়বস্তু, ভাষা সম্পর্কে ধারণা পেতে ও ব্যয়, সঞ্চয়, ভাগ ও দানের কার্যকরী কৌশলসমূহের সাথে পরিচিত হতে এটি একটি কার্যকরী উদ্যোগ।

‘ইচ্ছে জমা করি’ প্রোজেক্ট নিয়ে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন সিসিমপুরের ওয়েবসাইট। শিশুকে সাথে নিয়ে উপভোগ করুন মজার সব পর্ব বিটিভি এবং আরটিভির পর্দায়।