শিশুকে নৈতিকতা শেখানোর ৩ টি সহজ কৌশল

শিশুকে নৈতিকতা শেখানোর ৩ টি সহজ কৌশল

July 4, 2018 Moral Values 0

 

বাংলাদেশে এমন একজন অভিভাবকও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি চান না তার সন্তানের নৈতিকতার মান নিচে থাকুক। আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তান ব্যক্তিগত জীবনে সৎ, নৈতিক হোক এবং অপরকে সম্মান করুক। একই সাথে আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ব্যক্তিগত জীবনে সুখী হোক এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল হোক।

আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার জন্য আমরা আমাদের সন্তানদের দেশের সেরা স্কুলে পড়ানোর চেষ্টা করি, তার পড়াশুনার জন্য নিজেদের উপার্জনের অনেকটাই ঢেলে দেই। নিজেদের সময়ের এবং চিন্তার অনেকটা অংশ জুড়ে থাকে সন্তানকে কিভাবে সেরা স্কুল, কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে পড়াবো যেন বড় হয়ে সে একটা ভালো চাকরি পায়।

অথচ সন্তানকে একজন ভালো মানুষ হিসাবে, সৎ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য আমরা আমাদের সময়ের এবং চিন্তার কতটা ব্যয় করি? অথচ যারা এই লেখাটা পড়ছেন তাদের শতভাগ চান আপনার সন্তান একজন ভালো মানুষ হোক।

আমরা জানি কারণ আমরা আমাদের বিভিন্ন অভিভাবক ওয়ার্কশপে এই প্রশ্নটি করেছি অভিভাবকদের। আমাদের প্রশ্ন ছিল অভিভাবক হিসাবে আপনার সন্তানের কাছে আপনার সবচেয়ে বড় ২-৩ টি চাওয়া বা আকাঙ্ক্ষা কি? এই প্রশ্নের উত্তরে শতভাগ অভিভাবক বলেছেন তাদের প্রথম ২-৩ টি চাওয়ার মধ্যে একটি হচ্ছে যেন তার সন্তান একজন ‘ভালো মানুষ’ হয় এবং অন্যকে সম্মান করতে শেখে। সহজ কথায়, সন্তানের মধ্যে যেন নৈতিকতার গুণাবলিগুলো থাকে।

কিডস টাইমে যেসব শিশুরা ভর্তি হয় তাদের আমরা আমাদের কোর্সের মধ্যে নৈতিকতার কিছু বিষয় নিয়ে আসি। শিশুরা যেন শেয়ার করতে শেখে, অপরকে সম্মান করে ইত্যাদি। আমাদের Facilitator রা সচেতনভাবে ক্লাসের সময় এই কাজগুলো করে। কিন্তু আমাদের মতে অভিভাবকরা হচ্ছেন শিশুকে নৈতিকতা শেখানোর সবচেয়ে বড় শিক্ষক। আমরা তাই আমাদের এই লেখায় ৩ টি আচরণের কথা বলেছি যেটি অভিভাবক চাইলে এখন থেকেই প্রতিদিন শিশুর সাথে করতে পারেন।

পাশাপাশি আমরা নিয়মিতভাবে এখন থেকে এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের বিভিন্ন আর্টিকেলে তুলে ধরবো। অভিভাবকরা সেই বিষয়গুলো নিজেদের সন্তানের ক্ষেত্রে মেনে চললে আমরা আশা করছি খুব ভালো ফলাফল অভিভাবকরা পাবেন।

অ্যাডাম গ্রান্ট একজন বিখ্যাত সায়কোলজিষ্ট যিনি ১০ বছরের উপর গবেষণা করছেন কিভাবে শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা বৃদ্ধি করা যায়। তার একটি বিখ্যাত লেখা ছাপা হয়েছে The New York Times পত্রিকায়। আমরা সেই লেখার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ আমাদের এই লেখায় তুলে ধরছি। যারা পরবর্তীতে বিস্তারিতভাবে পুরো লেখাটি পড়তে চান তারা এই লিঙ্কে পড়তে পারেন।

তিনি অভিভাবকদের জন্য ৩ টি খুব সহজ সাজেশন দিয়েছেন।

Praise vs. Reward

শিশুর বয়স ২ বছরের পর থেকেই সে কিছু কিছু Moral Emotion এক্সপেরিয়েন্স করতে শুরু করে। এটি মূলত কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল – এই অনুভূতি থেকে জন্ম নেয়। আপনি যদি আপনার শিশুর মধ্যে Caring বা অপরের জন্য সহানুভূতি তৈরি করতে চান তাহলে তার কাজের প্রশংসা করুন। সে একটা ভালো কাজের জন্য প্রশংসা পেলো এটিই হওয়া উচিত তার পরবর্তী ভালো কাজের মোটিভেশন। কিন্তু আপনি যদি তার ভালো কাজের বিনিময়ে কোন উপহার বা reward তাকে দিতে চান তাহলে পরবর্তীতে সে কেবল সেই reward এর জন্যই হয়তো ভালো কাজটি করতে অনুপ্রেরণা পাবে।

তাই ভালো কাজের প্রশংসা করুন, appreciate করুন। এখন প্রশ্ন হল, প্রশংসা করার সবচেয়ে ভালো উপায় কোনটি? সেটি জানার জন্য পরের সাজেশনটি দেখুন।

 

Noun vs. Verb 

শিশুর Moral Behavior কে আরও বাড়াতে আপনি তার কোন একটা ভালো কাজকে প্রশংসা করার সময় এই পদ্ধতি অবলম্বন করুন। ধরুন আপনার শিশু তার কোন খেলনা কারও সাথে শেয়ার করলো, বা নিজের চকলেট থেকে একটু ছোট বোনকে দিলো। তখন তাকে আপনি হয়তো বলতে পারেন, বাহ, তুমি তোমার খেলনাটি শেয়ার করে খুব ভালো একটা কাজ করেছো। কিন্তু গবেষণা বলছে আপনি যদি বলেন, বাহ, তুমি তো খুব শেয়ারিং তাহলে পরবর্তীতে শিশু আবারও কোন জিনিস অন্য কারোর সাথে শেয়ার করতে উৎসাহ পাবে আগের চেয়েও বেশি। এখানে আপনি যেটি করেছেন তা হল তার ভালো কাজটির প্রশংসা না করে তার ভালো চরিত্রের প্রশংসা করলেন। একইভাবে গবেষণায় দেখা গেছে শিশুরা Cheating করা বা অসৎ উপায় অবলম্বন করা ৫০ ভাগ কমিয়ে দেয় এই একটি উপায়ে। ‘Please don’t cheat’ এটি না বলে তাকে বলুন ‘Don’t be a cheater’.

আপনি শিশুকে আপনার কোন কাজে সাহায্য করতে বলতে যদি চান, তাহলে ‘তুমি কি আমাকে একটু সাহায্য করবে?’ – এটি না বলে বলুন, ‘তুমি কি সাহায্যকারী হতে পারবে একটু?’

এখানে যে বিষয়টি হচ্ছে তা হল শিশু যখন তার চরিত্রের সাথে এই ভালো গুণগুলো যোগ হতে দেখে তখন সে আরও বেশি উৎসাহিত হয় একই কাজটি আবার করতে। সে ধরে নেয় তাকে ‘সাহায্যকারী’, ‘শেয়ারিং’ ইত্যাদি ভালো গুণের অধিকারী বলছে সবাই। তাই আমার উচিত হবে আমার এই গুণটি ধরে রাখা। এবং এইভাবেই নিজের অজান্তেই তার চরিত্রের মধ্যে এই গুণটি শক্তভাবে গেঁথে যাবে এবং বড় হয়ে সে একজন এই গুণের অধিকারী মানুষ হিসাবে গড়ে উঠবে।

Shame vs. Guilt 

অ্যাডাম গ্রান্ট বলছেন, শিশুরা যখন কোনও একটা ক্ষতি করে (যেমন, কিছু একটা ভেঙ্গে ফেলে) বা খারাপ কাজ করে (মিথ্যা বলা) তখন তার মধ্যে যেকোনো একটি অনুভূতি কাজ করে – লজ্জা অথবা দোষ (লজ্জিত অথবা দোষী)। লজ্জা হচ্ছে এমন একটা অনুভূতি যেখানে শিশু মনে করে আমি একটা খারাপ মানুষ। আর দোষ এমন একটা অনুভূতি যেখানে শিশু মনে করে আমি একটা ভুল বা খারাপ কাজ করেছি

লজ্জা এমন একটা অনুভূতি যেখানে শিশু নিজের সম্পর্কে খুব নেগেটিভ একটা ধারণা তৈরি করে। সে মনে করতে থাকে সে খুব ছোট, এবং worthless. অপরদিকে শিশু যখন নিজেকে দোষী মনে করে তখন সেটি ওই খারাপ কাজটির কথা সে ভাবে। সে মনে করে এই কাজ আমি আর না করলে বা আরেকটা ভালো কাজ করলে আগের দোষটি শেষ হয়ে যাবে।

অভিভাবকদের তাই মাথায় রাখতে হবে যেন শিশুরা কখনও একটা ভুল করে বা খারাপ কাজ করে লজ্জিত না হয়। বরং নিজেকে দোষী মনে করে। কারণ যখন শিশু লজ্জিত বোধ করতে থাকে তখন সে নিজেকেই একজন খারাপ মানুষ হিসাবে দেখতে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে যেসব অভিভাবকরা সাধারণত শিশুর কোন একটা ভুল বা খারাপ কাজের পর রাগ দেখায়, শিশুর প্রতি ভালোবাসা কমিয়ে দেয় অথবা শিশুকে শাস্তি দেয় সেসব ক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে লজ্জার অনুভূতি আরও প্রকট হয়। আর এই উপায়ে যদি অভিভাবক মনে করেন যে শিশুর আচরণ আপনি ঠিক করবেন তাহলে সেটি অনেক ভুল ধারণা।

শিশুর ব্যাবহার ঠিক করার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হচ্ছে শিশুর আচরণে হতাশা প্রকাশ করা। The New York Times আর্টিকেলে অ্যাডাম গ্রান্ট লিখেছেন, Caring Children হিসাবে নিজের শিশুকে গড়ে তুলতে চাইলে কার্যকর উপায় হচ্ছে প্রথমে তার খারাপ কাজের প্রতি হতাশা প্রকাশ করা, এরপর তাকে বলে কেন তার এই আচরণ ভুল এবং কিভাবে এটি অন্যদের ক্ষতি করছে আর কিভাবে শিশু এই ভুলটি শুধরাতে পারে।

তাই শিশু কোন একটা খারাপ কাজ করার পর তাকে বলুন, আমি খুব হতাশ হয়েছি তোমার এই কাজে। তোমার কাছ থেকে এই ধরণের কাজ আমি আশা করি না। আমি জানি তুমি এমন না। এবার একটা ভুল করে ফেলেছ। সামনে আর হয়তো এমনটা হবে না।

দয়া করে কখনই বলবেন না, তুমি একটা গাধা বা বোকা। কতবার বলেছি এটা না করতে, তাও বার বার করো। তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না…ইত্যাদি ইত্যাদি।  

আর বিশেষ করে এই ধরণের কথা যখন অন্য কারোর সামনে অভিভাবকরা বলেন যার বা যাদের সামনে শিশু comfortable না, তখন তারা লজ্জায় প্রায় মাটিতে মিশে যায়। ৫-৬ বছর বয়সেই শিশুর মধ্যে লজ্জার অনুভূতি তৈরি হয়ে যায়। তাই একাই থাকুন আর বাইরে বা অন্য কারোর সামনে থাকুন এই ধরণের কথা বা আচরণ কখনই শিশুর সাথে করবেন না। আপনার এই আচরণই আপনার অজান্তে আপনার শিশুকে ‘ভালো মানুষ’ হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্নের সবচেয়ে বড় বাধা হবে।

এই ৩ ধরণের আচরণ অভিভাবক হিসাবে যদি আজকে থেকেই আপনার সন্তানের সাথে করা শুরু করেন তাহলে অচিরেই আপনি আপনার সন্তানের মধ্যে পজিটিভ পরিবর্তন দেখতে পারবেন।

……………………………………………………………………………………………………………………………………………

সিসিমপুরের ইউটিউব চ্যানেলে বেশ কিছু চমৎকার ভিডিও আছে যেগুলোর মাধ্যমে শিশুকে আপনি পরিকল্পনা করা, আত্মনিয়ন্ত্রণ করা, ভাগাভাগি করা, সঞ্চয় করা ইত্যাদি শেখাতে পারেন। নিচের ছবিতে ক্লিক করে সরাসরি চলে যান সিসিমপুরের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে।

শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ শেখানোর জন্য সিসিমপুর বাংলাদেশে কাজ করছে গত ১০ বছর ধরে। তাদের টিভিতে প্রচারিত এপিসোডগুলো শিশুকে নিয়মিত দেখার সুযোগ করে দিন। এত এত চ্যানেলের ভিড়ে অভিভাবক এবং শিশুরা জানেই না কখন সিসিমপুর হয়। আর সিসিমপুর কেবল একটা শিশুতোষ অনুষ্ঠান নয়, বরং শিশুদের মানসিক বিকাশ থেকে শুরু করে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয় প্রতিটি পর্ব।

তাই মোটু-পাতলু বা কার্টুন নেটওয়ার্কের কার্টুনগুলো দেখার চেয়ে অনেক অনেক বেশি উপকারি সিসিমপুর বা সিসেমি স্ট্রীটের ভিডিওগুলো।

নিচে আমরা কখন কোন চ্যানেলে সিসিমপুর প্রচারিত হয় সেটি দেয়া হল। আশা করি অভিভাবকরা ওই সময়ে শিশুদের সিসিমপুর দেখার সুযোগ করে দিবেন।

 

 

 

……………………………………………………………………………………………………………………………………………

শিশুদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানো, এবং নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উন্নতির জন্য আমাদের সেন্টারে আমরা নিয়মিত কোর্স রেখেছি ৪-৮ বছর বয়সের শিশুদের জন্য। আপনার শিশুকে নিয়ে চলে আসুন আপনার কাছের কোন একটি সেন্টারে। আমাদের সেন্টারগুলো ঢাকায় ধানমণ্ডি, উত্তরা, গুলশান এবং মিরপুর ডিওএইচএসে আছে এবং চট্টগ্রামেও রয়েছে। বিস্তারিত দেখুন এখানে।

অথবা নিচের ছবি ক্লিক করুন।

কোর্স নিয়ে যেকোনো প্রশ্ন থাকলে কল করুন এই নাম্বারেঃ ০১৭৭১৫৮৮৪৯৪

আমাদের সেন্টারগুলোর অবস্থান খুঁজে পেতে চলে যান নিচের লিঙ্কে।

আমাদের সেন্টারগুলোর ম্যাপ 

আপনার শিশুকে আমাদের সামার কোর্সে ভর্তি করতে রেজিস্ট্রেশন করুন এই লিঙ্কে গিয়েঃ রেজিস্ট্রেশন লিঙ্ক

 

ঢাকার মতো আমাদের চট্টগ্রাম সেন্টারেও ভর্তি শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের অভিভাবকরা চাইলে রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন এই লিঙ্কে গিয়েঃ রেজিস্ট্রেশন লিঙ্ক 

অথবা নিচের ছবিতে ক্লিক করেও চলে যেতে পারেন।

 

চট্টগ্রাম সেন্টারে ভর্তি সংক্রান্ত কোন প্রশ্ন থাকলে সরাসরি যোগাযোগ করুন এই নাম্বারেঃ 01745110353